Saturday, January 9, 2016

হাসি ও কাশি

মানুষ সাধারণত দুই প্রকার। একদল হাসে, আরেকজন কাশে। এই প্রকারভেদ চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করার দরকার নেই। আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই আমি এ প্রকারভেদ করেছি। এটা কোনো স্কলারলি আর্টিকেল না যে এখানে চৌদ্দগুষ্টির রেফারেন্স থাকবে আর সবকিছু বেদবাক্য হয়ে যাবে। আসল কথায় যাই। পৃথিবীতে একদল হাসার জন্য আসে, আরেকদল কাশার জন্য। ভণিতা কমায় দেই। গলার কাছের শার্টের বোতামখানা খুলেই বলি। যাদের অর্থবিত্ত নিয়ে চিন্তা কম, মানে ইতিমধ্যে অর্থবিত্ত আছে, অভাব অপরিসীম হলেও, তা নিয়মিত পূরণ হয়, তারা হাসে। ভালো ভালো খাবার তারা খেতে পায়, ভালো পোশাক পরে, মাথার উপরে ছাদের ঢালাই তাদের ভালো, পেট খারাপ হলে তারা খাবার স্যালাইন খায় আর হাসে। হাসতে তাদের কষ্ট হয় না। জীবনযুদ্ধে সফল এই মানুষদের হাসা অবশ্য মানায়। বিজয়ীরাই হাসে। বিজিতরা নয়। আর পরাজিত, মানে জীবনযুদ্ধে পরাজিত, সীমিত অভাবে বেশিরভাগই যাদের পূরণ হয় না, তারা সস্তা বিড়ি খায় আর কাশে। কাশতে কাশতে তাদের চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসে। কাশার সময় তাদের মুখ দিয়ে কাশির কণা ছিঁটে বের হয় কখনও কখনও। কাশায় বিরতি দিয়ে তারা ধোঁয়া টানে। এরপর আবার কাশে। কাশাটা তাদের মানায়। কারণ, হাসার সুযোগ কম। কাশার জন্য এদের জন্ম হয়েছে। কেশে কিন্তু এরা আরাম পায়। ভেতরের অনুভূতি বের হবার একটা ব্যাপার আছে মানুষের। কেউ হেসে সেটা বের করে, কেউ কেশে। হাসা-কাশা নিয়ে খাসা একটা বয়াণ মনে পড়ে গেল। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শ্রেণি কক্ষে বলেছিলেন, তোমাদের বয়স এখন কত? ২৪-২৫? তোমাদের এখন লক্ষ্য কী? পাশ করা? এরপর চাকরি, বিয়েশাদি। এভাবে এক সময় তোমাদের বয়স ৪০ হবে। আর তখন তোমাদের ডায়াবেটিস হবে। ডায়াবেটিস খুব খারাপ অসুখ। অনেকটা এইডসের মতো। এইডস কী তা জানো তো? এইডস এমন এক খারাপ অসুখ যে কারো কাশার রোগ থাকলে সে কাশতে কাশতে মরে যায়। এ কথা শুনে যখন কক্ষ জুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল তখন তিনি বললেন, আবার কারো হাসার রোগ থাকলে সে হাসতে হাসতে মরে যাবে। এইখানে আমি একটা গভীর জীবনবোধ খুঁজে পাই। হাসা পার্টি এবং কাশা পার্টি- উভয় পার্টিই শেষ পর্যন্ত মরবে। তা সে এইডসে হোক আর অ-এইডসে হোক। এইটাকে অবশ্য জীবনবোধ না বলে মরণবোধ বললে ভালো হতো। মরার ব্যাপারটাকেও জীবনের একটা অংশ ধরে নিয়ে মরণ সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোকে গুণিজনেরা সুকৌশলে জীবনবোধের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, সহজ বাংলায় বললে, হান্দায় দিয়েছেন। আমাদের যেই জিনিসটা ভালো লাগে, সেই জিনিসটা আমরা সব কিছুর মধ্যে হান্দায় দেই। আমরা যখন রিকশা চালাই, তখন হঠাত বাঁয়ে যাওয়ার খেয়াল হলে আমরা বাঁয়ে রিকশাখানা হান্দায় দেই। অন্যের সুখ সহ্য না হলে আমরা জীবনে ঝামেলা হান্দায় দিতে চেষ্টা করি, অনেক সময় সফলও হই। আমরা হান্দায়া দেয়া জাতি। সে যাকগে। যারা হাসে তারাও কিন্তু কাশে। কাশার ওষুধ খেয়ে কাশা বন্ধ রাখে। আবার কাশার দলও কিন্তু হাসে। কালে-ভদ্রে না, প্রায়ই। তবে তাদের হাসা বন্ধের কোনো ওষুধ নাই। জীবনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নানা ঘটনার উৎপত্তি ঘটিয়ে এদের হাসি বন্ধ রাখে।


মানব জীবনে হাসা এবং কাশার কোনো বিকল্প নেই। কখনও হাসতে হবে, সময়ে সময়ে কাশতেও হবে। হাসাহাসি-কাশাকাশি নিয়েই জীবন। কারো হাসা বেশি, কারো কাশা। এ নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। তবে কাশার শব্দে বেশি সমস্যা হলে কানে ইয়ার প্লাগ লাগানো যেতে পারে। হাসার ক্ষেত্রেও একই সমাধান প্রযোজ্য। অতিরিক্ত ইয়ার প্লাগ ব্যবহারের ফলে কর্ণ-গহ্বরে অতিরিক্ত খৈল জমে গেলে তুলার কাঠি দিয়ে তা খুঁচিয়ে নিতে পারেন নিজ দায়িত্বে।


Ahmad Iqram Anam

Sunday, December 20, 2015

নতুন বেতন স্কেল: ভাল না মন্দ?

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল চূড়ান্ত অনুমোদন পেল এ মাসেই। যারা সরকারি চাকরি করেন, তারা আগের চেয়ে বেশি বেতন-ভাতা পাবেন। নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। টাকার অংক দ্বিগুন হয়ে গেল। সরকারের বেশ কিছু ভালো কাজের মাঝে এটিকে অবশ্যই রাখা যায়। এ ধরণের সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা বাড়িয়ে দেয়, সমর্থনও বাড়ায়। কিন্তু এখানে একটা কিন্তু আছে। খুব ভালো এই বেতন কাঠামোর ভেতরে কিছু বৈষম্যের ঘ্রাণ পাচ্ছেন অনেক সরকারি চাকরিজীবীই। 

বেতন কাঠামো খসড়া পর্যায়ে থাকার সময় থেকেই প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডার বাদে অন্য ক্যাডার, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক এবং অন্যান্য ফাংশনাল সার্ভিসের কর্মকর্তারা আন্দোলন করে আসছেন। তাদের আন্দোলনের তিনটি কারণ ছিল। এক, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিল করায় তাদের অনেকেই উচ্চপদে যেতে পারবেন না; দুই, পেশাজীবী ক্যাডার কর্মকর্তারা প্রায় শতভাগ সময়ে তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চ বা সর্বোচ্চ পদে যেতে পারেন না এবং তিন, উপজেলায় কর্মরত কর্মকর্তাদের বেতন বিলে ইউএনও'র স্বাক্ষর। এসব বিষয় নিরসন করার জন্যে তারা আন্দোলন করে আসছেন এখনও। তাদের দাবিগুলো কিন্তু অযৌক্তিক নয়। এদিকে যখন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত হয়ে গেল তখন দেখা গেল নতুন আরেক বৈষম্য। ক্যাডার কর্মকর্তারা চাকরি শুরু করবেন গ্রেড-৮ থেকে আর নন-ক্যাডার ও ফাংশনার সার্ভিসের কর্মকর্তারা গ্রেড-৯ থেকে। সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক কলামে যথার্থই বলেছেন যে নন-ক্যাডার পর্যায়ে অনেক প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাদের প্রতি এটি অন্যায়ই হয়ে যাবে। মোটা দাগে বললে, এক পরীক্ষা নিয়ে একটি রাষ্ট্রের সকল বিভাগের সকল কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়, যুক্তিসঙ্গতও নয়। সেজন্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগে প্রয়োজন অনুসারে টেকনিক্যাল পদে লোক নিয়োগ দেয়া হয়। এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এই টেকনিক্যাল লোকগুলো কোনোদিনও সরকারের উচ্চপদগুলোতে যেতে পারে না। অধিকাংশেরই সারা জীবনে কোনো পদোন্নতি হয় না, হলেও একটি, তাও শেষ বয়সে গিয়ে। সরকারের সকল বিভাগের ক্যাডার সার্ভিসও নেই। কোন সার্ভিসটি ক্যাডারে যাবে আর কোনটি যাবে না সেটি কীসের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছে তাও বোধগম্য নয়। ফলে ক্যাডারের বাইরে থাকা বহু দক্ষ কর্মকর্তা চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বৈষম্যের শিকার হবেন। এ বেতন কাঠামোতে শ্রেণি প্রথা উঠিয়ে দেয়া হলেও শ্রেণির ছায়া কিন্তু রয়ে যাবেই অনেকদিন পর্যন্ত। সে হিসেবে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের মাঝেও তৈরি হয়ে দু'টি ভাগ। ৮ম গ্রেড আর ৯ম গ্রেড।

বেতন বেড়ে যাবার পর সকলের খুশি হওয়ার কথা থাকলেও পদমর্যাদার লড়াইয়ে খুশি নেই অনেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ অসন্তুষ্ট এই পদমর্যাদা নিয়েই। টাকার অংক নিয়ে দ্বন্দ্ব কিন্তু নেই। গ্রেড-১ নিয়ে রয়েছে অনেক রকম মতভেদ। ৮০ এর দশকের পর থেকে এক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাদ দিয়ে সকল মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদগুলোতে ৯৫ ভাগের ওপরে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই পদায়ন করা হচ্ছে। আইন-আদালত করেও ব্যাপারটিকে এক রকম প্রতিষ্ঠিতই করা হয়েছে। এ নিয়ে ভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের রয়েছে ক্ষোভ। সকল ক্যাডার থেকে সমানভাবে সচিব বা গ্রেড-১ এ পদায়ন করে এ সমস্যার সমাধান করা গেলেও তা হয় নি। হয়েছে অন্য রকম ঘটনা। মন্ত্রণালয়ের অধীন অনেক অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদকে গ্রেড-১ করা হয়েছে। কিন্তু আসলে সমাধান এখানেও হয় নি। ঐ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ উঠিয়ে দিয়ে করা হয়েছে সিনিয়র সচিবের পদ। যেটি গ্রেড-১ এরও উপরে। ফলে নির্দিষ্ট একটি ক্যাডারের উচ্চপদ যথারীতি সংরক্ষিতই হয়েছে। প্রশাসনিক আদেশে এ ধরণের নতুন পদ সৃষ্টি করা যায় কিনা তা নিয়েও বাক-বিতণ্ডা রয়েছে। একেক সার্ভিসে গ্রেড-১ এর পদসংখ্যাও একেক রকম।

আশার কথা হলো, রাজনৈতিক সরকার রাষ্ট্রের জনগণের মঙ্গলের জন্য অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। ক্ষমতার অপব্যবহার মাইক্রো ও ম্যাক্রো পর্যায়ে থাকলেও তাদের সৎ উদ্দেশ্যকেও স্বাগত জানাতে হবে। আমরা আশা করব, এ ধরণের বৈষম্য বা দ্বন্দ্বের জায়গাগুলো ক্ষমতাসীন সরকার সমাধান করবেন কেননা তারা জনগণের ভোটে জনগণকে কথা দিয়েই সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ করে থাকেন।